বিস্তারিত
🎥 মুখ ও মুখোশ: যেখানে বাঙালির স্বপ্নের শুরু – ইতিহাসের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের গল্প
১৯৫৬ সালের ৩রা আগস্ট। ঢাকার আকাশ সেদিন মেঘলা ছিল নাকি রৌদ্রোজ্জ্বল, তা আজ আর জানার উপায় নেই। কিন্তু সেদিন ঢাকার ‘রূপমহল’ প্রেক্ষাগৃহে যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার দ্যুতি আজও অমলিন। বলছি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কথা।
আজকের ফোর-কে (4K) রেজ্যুলেশন আর মাল্টিপ্লেক্সের যুগে বসে সেই সাদা-কালো ঝাপসা ছবিটির গুরুত্ব বোঝা কঠিন। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদার এক জ্বলন্ত দলিল।
📜 একটি জিদের ফসল
গল্পটা শুরু হয়েছিল অপমানের জবাব হিসেবে। ১৯৫৩ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের এক চলচ্চিত্র পরিবেশক বলেছিলেন, “এই দেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) আবহাওয়া আর্দ্র, এখানে ফিল্ম নষ্ট হয়ে যাবে। এখানে সিনেমা বানানো সম্ভব নয়।”
এই কথাটি তীরের মতো বিঁধেছিল ইকবাল ফিল্মসের কর্ণধার ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান-এর বুকে। তিনি চ্যালেঞ্জ নিলেন। কোনো স্টুডিও নেই, ল্যাব নেই, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান নেই—শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষকে সঙ্গী করে তিনি নামলেন এক অসম যুদ্ধে।
🎬 কুশীলব: যারা ইতিহাস গড়েছিলেন
এই ছবির পেছনে যারা ছিলেন, তারা কেউই পেশাদার ছিলেন না। কিন্তু তাদের ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন।
আব্দুল জব্বার খান নিজেই কলম হাতে চিত্রনাট্য লিখলেন, আবার নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ও করলেন।
নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তা (কুলসুম চরিত্র) তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন।
জহরত আরা ও পিয়ারী বেগম-এর মতো নারীরা ভেঙে দিলেন সামাজিক ট্যাবু।
আর কৌতুক অভিনেতা সাইফউদ্দিন? তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ঢাকাই সিনেমা হাসাতে জানে।
খলনায়ক হিসেবে ইনাম আহমেদ-এর দাপট ছিল দেখার মতো।
🎶 সুরের ইন্দ্রজাল
‘মুখ ও মুখোশ’ সিনেমার গানগুলো ছিল অদ্ভুত মায়াময়। সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস-এর সুরে এবং লোকগানের সম্রাট আব্দুল আলীম ও কোকিলকণ্ঠী মাহবুবা রহমান-এর গাওড়া গানগুলো আজও নস্টালজিক করে তোলে। মাহবুবা রহমানের গাওয়া “মনের বনে দোলা লাগলো” গানটি শুনলে মনে হয়, এটিই আমাদের সিনেমার আদি সুর।
🛠 কারিগরি বাস্তবতা
আজকের দিনে ভাবলে অবাক হতে হয়, চিত্রগ্রাহক কিউ. এম. জামান শুটিং করেছিলেন একটি ভাঙাচোরা ‘আইমো’ ক্যামেরা দিয়ে। কোনো ট্রলি ছিল না, জুম লেন্স ছিল না। ইনডোর শুটিংয়ের জন্য টিনের চালে আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো রিফ্লেক্ট করে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারিগরি দিক থেকে হয়তো এটি নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেই প্রচেষ্টায় কোনো খাদ ছিল না।
‘মুখ ও মুখোশ’ আমাদের শিখিয়েছে, সম্পদ না থাকলেও স্বপ্ন থাকলে পাহাড় টলানো যায়। আজকের শাকিব খান, চঞ্চল চৌধুরী বা সিয়াম আহমেদরা যে ইন্ডাস্ট্রিতে দাঁড়িয়ে আছেন, তার প্রথম ইটটি গেঁথেছিলেন আব্দুল জব্বার খান ও তার দল।
তাই বাংলা সিনেমার কথা উঠলে সবার আগে স্যালুট জানাতে হয় এই মাটির প্রথম সিনেমাটিকে। ‘মুখ ও মুখোশ’—আমাদের গর্ব, আমাদের ইতিহাসের সেলুলয়েড দলিল।
আপনার কি এই সিনেমাটি দেখার সুযোগ হয়েছে? অথবা আপনার দাদা-দাদির কাছে এর গল্প শুনেছেন? কমেন্টে আমাদের জানান!
এই লেখায় আপনার প্রতিক্রিয়া
একটি প্রতিক্রিয়া বেছে নিন; সরাতে আবার চাপুন।

