বিস্তারিত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়—তারপরও যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। ক্যামেরার জন্য সাজানো নয়, কোনো সংলাপও লেখা থাকে না; তবু সেই মুহূর্তের আবেগ দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায় গভীরভাবে।
সম্প্রতি তেমনই এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হলো বাংলা চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তিকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখতে তাঁর বাসায় ছুটে গেলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শবনম। যাঁকে বাংলাদেশের কোটি দর্শক আজও মনে রেখেছেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘আম্মাজান’-এর সেই মমতাময়ী মায়ের চরিত্রে।
হঠাৎ সামনে শবনমকে দেখে যেন কিছুক্ষণের জন্য বিস্মিত হয়ে পড়েন ইলিয়াস কাঞ্চন। পরিচিত সেই মুখ, চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের একজন প্রিয় মানুষ—এভাবে সামনে এসে দাঁড়াবেন, হয়তো তিনি ভাবেননি। আর সেই আকস্মিক সাক্ষাৎই তৈরি করে অসাধারণ কিছু মুহূর্ত।
হঠাৎ শবনমকে দেখে অবাক ইলিয়াস কাঞ্চন
অসুস্থতার দীর্ঘ সময় একজন মানুষের জীবনকে অনেকটাই বদলে দেয়। পরিচিত ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়, শুটিং কিংবা চলচ্চিত্রের অনুষ্ঠান—সবকিছু থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হয়। এমন একটি সময়ে বহুদিনের পরিচিত কোনো মানুষ যখন হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ান, তখন সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
শবনমকে সামনে দেখে ইলিয়াস কাঞ্চনের অভিব্যক্তিতেও যেন ফুটে উঠেছিল সেই বিস্ময় এবং আনন্দ।
এটি ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। ছিল না চলচ্চিত্রের কোনো প্রচারণা কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন। একজন প্রবীণ শিল্পী আরেকজন অসুস্থ সহশিল্পীকে দেখতে গেছেন—এর চেয়ে সাধারণ ঘটনা হয়তো আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু মানুষ দুটি যখন শবনম ও ইলিয়াস কাঞ্চন, তখন সেই সাধারণ ঘটনাই হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য বিশেষ এক স্মৃতি।
কথা, হাসি, স্মৃতিচারণ এবং একে অপরের প্রতি আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে কাটানো সময় যেন মুহূর্তের জন্য ফিরিয়ে নিয়ে যায় বাংলা সিনেমার সেই পুরোনো দিনগুলোতে।
পর্দার বাইরেও শিল্পীদের সম্পর্কের অন্য এক গল্প
চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে দর্শক সাধারণত তাঁর চরিত্র দিয়েই মনে রাখেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তাঁদেরও রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা এবং অসংখ্য স্মৃতি।
এক সময় এফডিসি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের শিল্পীদের মিলনমেলা। দিনের পর দিন একই স্টুডিওতে শুটিং, পাশাপাশি মেকআপ রুম, আড্ডা, গল্প কিংবা কোনো সহশিল্পীর সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো—এসবের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে বহু গভীর সম্পর্ক।
সময় বদলেছে। চলচ্চিত্রের জগতও বদলেছে। অনেকেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, কেউ অভিনয় থেকে দূরে সরে গেছেন, কেউ বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে জনসম্মুখে খুব একটা আসেন না।
তারপরও পুরোনো সেই সম্পর্কগুলো যে হারিয়ে যায়নি, শবনমের এই সাক্ষাৎ যেন আবারও সেটিই মনে করিয়ে দিল।
‘আম্মাজান’ বললেই আজও যে মুখটি মনে পড়ে
শবনম বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ছবিতে অভিনয় করলেও বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁকে বিশেষভাবে পরিচিত করে রেখেছে ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রটি।
১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’-এ শবনম অভিনয় করেছিলেন জাহানারা তথা ‘আম্মাজান’ চরিত্রে। তাঁর ছেলের চরিত্র ‘বাদশাহ’ হয়ে পর্দায় ছিলেন প্রয়াত নায়ক মান্না। চলচ্চিত্রটির প্রধান অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে আরও ছিলেন মৌসুমী, আমিন খান ও মনোয়ার হোসেন ডিপজল।
মা ও সন্তানের সম্পর্ক, ত্যাগ, ভালোবাসা ও আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের মনে আলাদা জায়গা তৈরি করে নেয়।
বিশেষ করে মান্না ও শবনমের মা-ছেলের সম্পর্কের উপস্থাপন দর্শকের মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল যে, এত বছর পরও শবনমকে দেখলে অনেক দর্শকের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে—‘আম্মাজান’।
পর্দার সেই মমতাময়ী ‘আম্মাজান’কে এবার বাস্তব জীবনে দেখা গেল আরেক কিংবদন্তি শিল্পীর পাশে।
অসুস্থতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই ইলিয়াস কাঞ্চনের
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন, তিনি একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। রোমান্টিক, সামাজিক, পারিবারিক থেকে শুরু করে নানা ধরনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করে কয়েক দশক দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়টি অবশ্য এই অভিনেতা এবং তাঁর পরিবারের জন্য বেশ কঠিন।
মস্তিষ্কে টিউমার শনাক্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট লন্ডনে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত চিকিৎসা ও থেরাপি চলতে থাকে। ২০২৬ সালের জুনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর চিকিৎসা তখনও চলমান ছিল এবং কথা বলার ক্ষেত্রেও কিছুটা জটিলতা ছিল।
এমন অবস্থায় পরিচিত ও প্রিয় মানুষদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একজন অসুস্থ মানুষের মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দেয়।
শবনমের এই দেখা করতে যাওয়া তাই কেবল সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যে রয়েছে একজন সহশিল্পীর প্রতি আরেকজন সহশিল্পীর মমতা, ভালোবাসা এবং দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রকাশ।
যেন সময় থমকে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য
দুই বর্ষীয়ান শিল্পী পাশাপাশি বসে আছেন। একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছেন। হয়তো কথা হচ্ছে পুরোনো দিনের। হয়তো মনে পড়ছে শুটিংয়ের দিনগুলোর কথা। আবার হয়তো খুব বেশি কথারও প্রয়োজন পড়ছে না।
কারণ কিছু সম্পর্কের ভাষা কথা দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না।
একটি হাসি, একটি দৃষ্টি কিংবা পাশে বসে কিছুটা সময় কাটানোই অনেক কিছু বলে দেয়।
ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে শবনমের এই মুহূর্তগুলোও যেন তেমনই।
দর্শকের কাছে তাঁরা বড় তারকা। কিন্তু এই সাক্ষাতের ছবিগুলোতে তারকাখ্যাতির চেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে দুই মানুষের সম্পর্ক।
সেখানে নেই নায়ক-নায়িকা কিংবা কিংবদন্তি হওয়ার দূরত্ব। আছে একজন অসুস্থ মানুষ এবং তাঁকে দেখতে আসা দীর্ঘদিনের একজন পরিচিত মানুষের আন্তরিকতা।
হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনের মানুষগুলো
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
নায়করাজ রাজ্জাক, মান্না, জসিম, সালমান শাহ, বুলবুল আহমেদ, ওয়াসিমসহ অসংখ্য জনপ্রিয় শিল্পী আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আবার যাঁরা আছেন, তাঁদেরও অনেকেই বয়সের কারণে চলচ্চিত্রের নিয়মিত কর্মকাণ্ড থেকে দূরে।
তাই পুরোনো দিনের দুই পরিচিত মুখকে যখন আবার পাশাপাশি দেখা যায়, দর্শকের মনে স্বাভাবিকভাবেই নস্টালজিয়া তৈরি হয়।
শবনম এবং ইলিয়াস কাঞ্চনের এই সাক্ষাৎও যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের একটি ছোট্ট জানালা খুলে দেয়।
যে সময় সিনেমার পোস্টারে তাঁদের নাম দেখলে দর্শক হলে ছুটে যেতেন, সিনেমা নিয়ে আলোচনা হতো চায়ের দোকান থেকে পরিবারের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত।
আজ হয়তো সেই সময় নেই। কিন্তু সেই মানুষগুলো এখনও দর্শকের স্মৃতিতে জীবন্ত।
ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু নায়ক নন
ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিচয় শুধু চলচ্চিত্র অভিনেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ব্যক্তিজীবনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারানোর পর তিনি নিরাপদ সড়কের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন শুরু করেন। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের মাধ্যমে বছরের পর বছর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে আসছেন তিনি।
ফলে একটি সময়ের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নায়ক ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন একটি সামাজিক আন্দোলনের পরিচিত মুখেও।
এ কারণেই তাঁর অসুস্থতার খবর শুধু চলচ্চিত্রের মানুষ কিংবা তাঁর ভক্তদেরই নয়, দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষকেও ব্যথিত করেছে।
দেশ-বিদেশে থাকা ভক্তরা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর সুস্থতা কামনা করছেন।
সহশিল্পীর পাশে সহশিল্পী—এটাই চলচ্চিত্র পরিবারের সৌন্দর্য
এক সময় যাঁদের ঘিরে বাংলা চলচ্চিত্রের বিশাল জগৎ তৈরি হয়েছিল, তাঁদের আজ বয়স হয়েছে। জীবনের অনেক পথ পেরিয়ে এসেছেন তাঁরা।
ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়ে হয়তো নিয়মিত দেখা হয়েছে। কখনও একই অনুষ্ঠানে, কখনও এফডিসিতে, কখনও শুটিংয়ের কাজে।
সময়ের সঙ্গে সেই দেখা কমেছে।
কিন্তু বিপদের সময়ে একজন আরেকজনকে মনে রাখা—এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শবনমের ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখতে যাওয়ার মুহূর্তটি সেই মানবিকতার কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়।
একজন মানুষ যখন অসুস্থ থাকেন, তখন ওষুধ এবং চিকিৎসার পাশাপাশি প্রিয় মানুষের উপস্থিতিও অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কাছে গিয়ে বসা, হাত ধরে থাকা, দুটো কথা বলা কিংবা শুধু হাসিমুখে তাকিয়ে থাকা—এসব ছোট ছোট বিষয় কখনও কখনও অসুস্থ মানুষের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
দর্শকের প্রার্থনা—সুস্থ হয়ে ফিরুন প্রিয় নায়ক
একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর দর্শকের ভালোবাসা।
ইলিয়াস কাঞ্চন দীর্ঘ অভিনয়জীবনে সেই ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তাঁর অভিনীত অসংখ্য চলচ্চিত্র আজও দর্শক দেখেন, তাঁর পুরোনো সিনেমার গান ও দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর অসুস্থতার খবর তাই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন করেছে ভক্তদের।
শবনমের সঙ্গে তাঁর এই আবেগঘন সাক্ষাতের মুহূর্তগুলো দর্শকের জন্য যেমন স্মৃতিময়, তেমনি নতুন করে একটি প্রত্যাশাও তৈরি করে—
প্রিয় নায়ক আবার সুস্থ হয়ে উঠুন।
আবার পরিচিত হাসিতে দর্শকের সামনে আসুন।
একটি সাক্ষাৎ, হাজারো স্মৃতি
শেষ পর্যন্ত শবনম ও ইলিয়াস কাঞ্চনের এই সাক্ষাৎকে শুধু দুই তারকার দেখা হওয়া বললে হয়তো পুরো গল্পটি বলা হবে না।
এটি একই সঙ্গে বন্ধুত্বের গল্প, সহমর্মিতার গল্প, সময়ের গল্প এবং বাংলা চলচ্চিত্রের একটি দীর্ঘ ইতিহাসের দুই জীবন্ত প্রতিনিধির গল্প।
একদিকে ‘আম্মাজান’-এর শবনম—যাঁর মাতৃস্নেহের অভিনয় আজও কোটি দর্শকের চোখ ভিজিয়ে দেয়।
অন্যদিকে ইলিয়াস কাঞ্চন—বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের স্বপ্নের নায়ক, যিনি পরবর্তী সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে তাঁদের এমন আন্তরিক সাক্ষাৎ তাই দর্শকের মন ছুঁয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।
কখনও কখনও একটি ছবি, একটি হাসি কিংবা পাশাপাশি বসে থাকা দুজন মানুষের মুহূর্তই অনেক বড় গল্প বলে।
শবনম ও ইলিয়াস কাঞ্চনের এই অসাধারণ মুহূর্তগুলোও হয়তো ভবিষ্যতে বাংলা চলচ্চিত্রের স্মৃতির পাতায় তেমনই একটি আবেগময় গল্প হয়ে থাকবে।
আর দর্শকের একটাই চাওয়া—
এই লেখায় আপনার প্রতিক্রিয়া
একটি প্রতিক্রিয়া বেছে নিন; সরাতে আবার চাপুন।

