দ্য লাস্ট কিস (The Last Kiss) ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা বর্তমান বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এটিকে ঢাকায় নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়।
১. সাধারণ তথ্য
- নাম: দ্য লাস্ট কিস (The Last Kiss)
- মুক্তির বছর: ১৯৩১
- ধরন: নির্বাক চলচ্চিত্র (Silent Film)
- ভাষা: নির্বাক হলেও এর সাবটাইটেল বা ধরণি (Title Cards) ছিল তিনটি ভাষায়: বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দু।
- দৈর্ঘ্য: প্রায় ৯০ মিনিট (১২ রিল)।
২. নির্মাণ ও প্রযোজনা
- প্রযোজনা সংস্থা: ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ সোসাইটি (Dhaka East Bengal Cinematograph Society)। এটি মূলত ঢাকার নবাব পরিবারের তরুণ সদস্যদের উদ্যোগে গঠিত একটি সংস্থা ছিল।
- পরিচালক: অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত (তিনি জগন্নাথ কলেজের শরীরচর্চার প্রশিক্ষক ছিলেন)।
- প্রযোজক: এই চলচ্চিত্রের মূল উদ্যোক্তা ও প্রযোজক ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা। বিশেষ করে খাজা আজমল, খাজা আদিল, খাজা আকমল প্রমুখের অবদান ছিল মুখ্য।
- বাজেট: সেই সময়ে ছবিটির নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ১২,০০০ টাকা (তৎকালীন মূল্যে যা অনেক বেশি)।
৩. অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলী
চলচ্চিত্রটির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ছিলেন মূলত শৌখিন এবং নবাব পরিবারের সদস্য। তবে নারী চরিত্রের জন্য তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের কারণে সাধারণ পরিবারের মেয়েদের পাওয়া যায়নি, তাই চটুল পেশার (যৌনকর্মী) নারীদের অভিনেত্রী হিসেবে নেওয়া হয়েছিল।
- প্রধান অভিনেতা (নায়ক): খাজা আজমল (যিনি চিত্রগ্রহণের কাজও করেছিলেন)।
- প্রধান অভিনেত্রী (নায়িকা): ললিতা (যাকে ‘বুড়ি’ নামেও ডাকা হতো)।
- অন্যান্য শিল্পী: চারুবালা, দেববালা (দেবী), হরিমতি, খাজা নসরুল্লাহ, খাজা আদিল, খাজা শাহেদ, শৈলেন রায় (টোনা বাবু) প্রমুখ।
- চিত্রগ্রহণ (Cinematography): খাজা আজমল (সহায়তায় ছিলেন খাজা আজাদ)।
- সাবটাইটেল লেখক: বাংলা ও ইংরেজি সাবটাইটেল লিখেছিলেন পরিচালক অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত নিজে এবং উর্দু সাবটাইটেল লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আন্দালিব শাদানি।
৪. কাহিনি সংক্ষেপ
এটি একটি রোমান্টিক অ্যাকশনধর্মী ছবি ছিল। ছবিটির প্রিন্ট বা রিল বর্তমানে সংরক্ষিত নেই বলে এর পূর্ণাঙ্গ কাহিনি জানা কঠিন। তবে জানা যায়, এতে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব, নায়িকাকে অপহরণ এবং তাকে উদ্ধারের ঘটনা ছিল। ছবির শেষ দৃশ্যে নায়ক ও নায়িকার চুম্বন দৃশ্য ছিল, যার কারণে ছবিটির নাম ‘দ্য লাস্ট কিস’ রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
৫. মুক্তি ও প্রদর্শন
- প্রিমিয়ার: ১৯৩১ সালে ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত মুকুল হলে (যা পরে আজাদ সিনেমা হল নামে পরিচিত হয়) ছবিটির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়।
- উদ্বোধন: উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার।
- প্রক্রিয়াকরণ: ছবিটির শুটিং ঢাকায় হলেও এর পরিস্ফুটন (Developing) বা ল্যাবরেটরির কাজ করা হয়েছিল কলকাতায় (কোনো কোনো সূত্র মতে লাহোরে)।
৬. ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা
- হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র: দুর্ভাগ্যবশত, এই চলচ্চিত্রের কোনো প্রিন্ট বা কপি বর্তমানে সংরক্ষিত নেই। এটি একটি ‘লস্ট ফিল্ম’ (Lost Film) হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে এই ছবির কেবল গুটিকয়েক স্থিরচিত্র (Stills) সংরক্ষিত আছে।
- বাঙালি মুসলমানের অবদান: তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় ঢাকার নবাব পরিবারের মুসলিম তরুণদের চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসা ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
‘দ্য লাস্ট কিস’ কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি ঢাকাই সিনেমার আদি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা প্রমাণ করে যে ১৯৫০-এর দশকের ‘মুখ ও মুখোশ’ (প্রথম সবাক চলচ্চিত্র)-এর বহু আগেই ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।