সম্পূর্ণ রিভিউ
ইতিহাসের সেলুলয়েড দলিল: ‘মুখ ও মুখোশ’
পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ
সিনেমার পর্দা যখন সাদা-কালো থেকে রঙিন হলো, প্রযুক্তি যখন অ্যানালগ থেকে ডিজিটালে পৌঁছাল—তখন পেছনের দিকে তাকালে একটি নামই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে। সেটি ‘মুখ ও মুখোশ’। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক অবজ্ঞার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় ‘ভিজুয়াল প্রোটেস্ট’ বা দৃশ্যমান প্রতিবাদ। ১৯৫৬ সালের ৩রা আগস্ট মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটি কেমন ছিল? আজকের লেন্স দিয়ে দেখলে এর বিচার কীভাবে হবে? চলুন, ইতিহাসের সেই ধুলোমাখা রিলগুলো একটু ঘুরিয়ে দেখা যাক।
১. প্রেক্ষাপট: একটি জিদের ফসল
পশ্চিম পাকিস্তানের ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটর এফ. দোশানি যখন তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, "এই আর্দ্র আবহাওয়ায় ফিল্ম নষ্ট হয়ে যাবে, এখানে সিনেমা বানানো সম্ভব নয়"—তখন সেটা কেবল আবহাওয়া নিয়ে মন্তব্য ছিল না, ছিল আমাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন। পরিচালক আব্দুল জব্বার খান সেই অপমান গিলে ফেলেননি। তিনি চ্যালেঞ্জ নিলেন। কোনো স্টুডিও নেই, ল্যাব নেই, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান নেই—শুধুমাত্র অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে তিনি নামলেন এই অসম যুদ্ধে। তাই এই সিনেমাকে বিচার করতে হলে হলিউড বা বলিউডের মাপকাঠিতে নয়, বিচার করতে হবে তৎকালীন পরিস্থিতির বিচারে।
২. গল্প ও চিত্রনাট্য: নাটক যখন সিনেমায়
ছবিটির গল্প নেওয়া হয়েছিল পরিচালকের নিজের লেখা নাটক ‘ডাকাত’ থেকে। গল্পের বুনন ছিল বেশ চমকপ্রদ। একদিকে দস্যু সর্দার শের দস্তগীর, অন্যদিকে সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোকেরা। সিনেমার নাম ‘মুখ ও মুখোশ’ সার্থক হয়ে ওঠে যখন দর্শক আবিষ্কার করেন, ডাকাতের পোশাকের আড়ালে থাকা মানুষটিই হয়তো আসল ‘মানুষ’, আর সমাজের উঁচুতলার বাসিন্দারা পরে আছেন ভদ্রতার ‘মুখোশ’। গল্পে বিচ্ছেদ, প্রেম, অ্যাকশন এবং পারিবারিক ড্রামার যে মিশ্রণ ছিল, তা সেই সময়ের দর্শকের রুচির সাথে পুরোপুরি মানানসই।
৩. অভিনয়: অপেশাদারী কিন্তু আন্তরিক
এই ছবির কুশীলবদের কেউই পেশাদার ছিলেন না। তারা এসেছিলেন রেডিও, মঞ্চ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
- আব্দুল জব্বার খান নিজে নায়ক চরিত্রে ছিলেন কিছুটা আড়ষ্ট, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব ছিল পর্দায় মানানসই।
- নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তা (কুলসুম চরিত্র) ছিলেন বিস্ময়কর। সেই সময়ে ক্যামেরার সামনে একজন নারীর এমন সাবলীল উপস্থিতি ছিল অবিশ্বাস্য।
- জহরত আরা এবং পিয়ারী বেগম-এর মতো অভিনেত্রীরা সামাজিক ট্যাবু ভেঙে পর্দায় এসেছিলেন, যা তাদের অভিনয়ের চেয়েও বড় অর্জন।
- তবে সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন সাইফউদ্দিন। তার কৌতুক অভিনয় বুঝিয়ে দিয়েছিল, ঢাকাই সিনেমা একজন দীর্ঘমেয়াদী কমেডিয়ান পেতে যাচ্ছে।
- খলনায়ক হিসেবে ইনাম আহমেদ-এর চাহনি ছিল ভীতিজাগানিয়া।
৪. কারিগরি দিক: সীমাবদ্ধতার মাঝেও সৃজনশীলতা
আজকের দিনে আমরা ৪কে রেজ্যুলেশন নিয়ে কথা বলি, অথচ চিত্রগ্রাহক কিউ. এম. জামান কাজ করেছিলেন একটি ভাঙাচোরা ‘আইমো’ ক্যামেরা দিয়ে। কোনো ট্রলি ছিল না, জুম লেন্স ছিল না। হাতের ওপর ক্যামেরা রেখেই তিনি শুটিং করেছেন। আলোর অভাবে টিনের চালে আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো রিফ্লেক্ট করে শুটিং করা হয়েছে। এই কারিগরি দৈন্যদশা ছবিতে স্পষ্ট—কখনও ফোকাস নড়ে গেছে, কখনও সাউন্ড অস্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু জামান সাহেবের এই প্রচেষ্টা ছিল আক্ষরিক অর্থেই ‘হিরোইক’।
৫. সঙ্গীত ও শব্দ: প্রাণের সুর
সিনেমার প্রাণ ছিল এর গান। সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস এবং কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম ও মাহবুবা রহমান মিলে যা সৃষ্টি করেছিলেন, তা ছিল বিশুদ্ধ বাঙালি আবেগ।
- মাহবুবা রহমানের কণ্ঠে "মনের বনে দোলা লাগলো" গানটি শুনলে আজও মনে হয়, এটিই আমাদের সিনেমার আদি সুর।
- পল্লীসম্রাট আব্দুল আলীমের দরাজ কণ্ঠ ছবির মাটির গন্ধকে আরও গাঢ় করেছিল।
৬. চূড়ান্ত রায় (Verdict)
‘মুখ ও মুখোশ’ হয়তো প্রযুক্তির বিচারে নিখুঁত কোনো সৃষ্টি নয়। এর মেকিংয়ে অপেশাদারিত্বের ছাপ ছিল, সম্পাদনায় ঝু্ঁকি ছিল। কিন্তু এই ছবির গুরুত্ব তার নির্মাণশৈলীতে নয়, তার ‘অস্তিত্বে’।
এই ছবিটি প্রমাণ করেছিল, বাঙালি পারে। এটি ছিল আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তিপ্রস্তর। আজকের শাকিব খান, চঞ্চল চৌধুরী বা সিয়াম আহমেদরা যে ইন্ডাস্ট্রিতে দাঁড়িয়ে আছেন, তার প্রথম ইটটি গেঁথেছিলেন আব্দুল জব্বার খান ও তার দল।
সুতরাং, ‘মুখ ও মুখোশ’ কেবল একটি সিনেমা নয়; এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক বিজয়ের এক ঐতিহাসিক দলিল।
রেটিং:
🎬 ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ১০/১০
🎭 অভিনয়: ৭/১০
🎶 সঙ্গীত: ৯/১০
🎥 নির্মাণশৈলী (তৎকালীন প্রেক্ষাপটে): ৮/১০
এই লেখায় আপনার প্রতিক্রিয়া
একটি প্রতিক্রিয়া বেছে নিন; সরাতে আবার চাপুন।



